সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪৩ পূর্বাহ্ন

আলোচিত সংখ্যালঘু আনন্দ হত্যার চাঞ্চল্যকর তথ্য

জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট প্রতিনিধি:
বহুল আলোচিত লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার বান্দের কুড়ার সংখ্যালঘু আনন্দ মোহন হত্যাকান্ডের দীর্ঘ এক বছর পর চাঞ্চল্যকর তথ্য বেড়িয়ে আসতে শুরু করেছে। এ হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত সন্দেহে প্রকৃত খুনিদের দীর্ঘ দিন পর গ্রেফতার করেছে সিআইডি পুলিশ। হত্যাকান্ডের সাথে স্থানীয় এক রাঘব বয়াল জড়িত আছে বলে ওই এলাকায় চলছে জল্পনা কল্পনা। ইতোমধ্যে মামলার তদন্ত কারী কর্মকর্তা অন্যত্র বদলি হওয়ার পর পুনরায় সেখানে এক কর্মকর্তার উপর তদন্তের ভার ন্যাস্ত করা হয়েছে। দীর্ঘ এক বছর অতিবাহিত হওয়ার পর হত্যকান্ডের প্রকৃত রহস্য ও তদন্তের বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটন হয়েছে এবং ইতো মধ্যে ৫ আসামীকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি পুলিশ। এই হত্যাকান্ডের সাথে ওই এলাকার এক প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির নিদের্শে তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে বলে আবাস পাওয়া গেছে।
মামলা সুত্রে জানা গেছে, কালীগঞ্জ উপজেলার চলবলা ইউনিয়নের বান্দের কুড়া গ্রামের মৃত দক্ষিনা বর্ম্মনের পুত্র আনন্দ মোহনের স্ত্রীর সাথে দীর্ঘদিন থেকে পার্শ্ববর্তী শফিকুল ইসলাম নামের এক যুবকের অবৈধ সম্পর্ক ছিল। তদন্তের পর বিষয়টি সিআইডি পুলিশ নিশ্চিত করেছে। এ নিয়ে তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায় ঝগড়া-বিবাধ লেগেই থাকতো। এক পর্যায়ে আনন্দের স্ত্রী কল্পনা রানী নারায়নগঞ্জে তার ভাই স্বপনের কাছে চলে যায়। এরপর থেকে আনন্দ তার নিজ বাড়িতে একাই বসবাস করত। এদিকে আনন্দ মোহনের স্ত্রী কল্পনা রানীর পরকিয়ার কারনেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে। এছাড়াও উক্ত আনন্দ মোহনের প্রায় ৭০শতাংশ জমি রয়েছে যা অন্যের কাছে বন্ধক আছে। তার জমি মুল্যবান হওয়ায় একটি মহল জমি আত্মসাৎ করার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে থাকে এবং কল্পনার প্রেমিকার সাথে আতাঁত করে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে বলে তার পরিবার সুত্রে জানা যায়।
তবে অন্য একটি সুত্র জানায়, নিহতের স্ত্রীর সাথে একাধিক ব্যক্তির অবৈধ সম্পর্ক থাকার কারনে তারা কিলার বাহিনীকে ভাড়া করে তাকে হত্যা করার জন্য। সুত্রটি আরো জানায়, ঘটনার দিন রাতে শিয়াল খোয়া বাজারে পুর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বপনের নেতৃত্বে সন্ত্রাসী বাহিনী আনন্দকে একা পেয়ে একটি গোপন আস্তানায় নিয়ে যায়। সেখানে ওই প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি ছিল বলেও ধারনা করা হচ্ছে। এসময় সেখানে তাকে এলোপাথারি মারপিট করা হয়। একপর্যায়ে নিজেকে বাচাঁতে সেখান থেকে পালিয়ে যায়। কিলার বাহিনী তার পিছু নেয়। পরে আনন্দ গোড়ল ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ড সদস্য শফিকুল ইসলামের বাড়ির সামনে গেলে অবস্থা বেগতিক দেখে কিলার বাহিনী পিছু হটে। ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলাম তার বাড়ির সামনে এলে সে আনন্দকে বাঁচাও বাচাঁও বলে চিৎকার করতে দেখে। এসময় তিনি আনন্দকে জিজ্ঞসা করেন কে তোকে মারবে। উত্তরে আনন্দ বলে আমার শশুর বাড়ির ও শিয়াল খোওয়ার কিছু লোকজন আমাকে মেরে ফেলার জন্য ধাওয়া করছে। পরে উপি সদস্য শফিকুল তার বাড়িতে জায়গা না থাকায় তার ফুফাতো ভাই আতিয়ারের বাড়িতে থাকার জন্য পরামর্শ দেন। কিন্তু আনন্দ তার কথা বিশ্বাস না করে সেখান থেকে প্রায় তিন কিঃমিঃ দুরে পোড়াবাড়ি গ্রামের মৃত আবুল হাজির পুত্র আকবরের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় চায়। কিন্তু আকবর বাড়িতে না থাকায় তার ছোট ভাই আমির হোসেন তাকে অন্যত্র পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয় এবং সেখান থেকে সে সোনাহাটের দিকে চলে যায়।
পরে আকবর আলীর সাথে কথা হলে তিনি দুঃখ করে বলেন, আমি সেদিন বাড়িতে থাকলে হয়তো আনন্দকে কেউ মেওে ফেলতে পারত না। তিনি আরও জানান, উক্ত আনন্দ তার গানের দলে ১৮ বছর ভিলেনি অভিনয় করেছে। সে মানুষ হিসেবে খুবই ভাল ছিল বলেও আকবর আলী জানান। আনন্দকে অনেকে পাগল বলছে এর উত্তরে আকবর আলী বলেন, যারা তাকে পাগল বলছে তারাই তাকে হত্যা করে এখন পাগল হিসেবে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে এবং নিজেদের বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিয়াল খোওয়া এলাকার এক ব্যক্তি বলেন, নিহত হওয়ার পুর্বে গভীর রাতে আতংক অবস্থায় আনন্দ মোহনকে সোনাহাট বাজার থেকে পান সিগারেট ক্রয় করে বাড়ি ফিরতে দেখা গেছে। হয়তো বাড়ি ফেরার সময় পথি মধ্যে সন্ত্রাসীরা তাকে ধরে নিয়ে নির্জন এলাকায় শ্বাসরোধে ও পিটিয়ে হত্যা করে উলঙ্গ অবস্থায় মৃত জয়নালের স্ত্রী বুলবুলির গোয়াল ঘরে লাশ ঝুলিয়ে রাখে। পরদিন ২১/৫/১৭ ইং খবর পেয়ে কালিগঞ্জ থানা পুলিশ তারিখে লাশ উদ্ধার পুর্বক ময়না তদন্ত সম্পন্ন করে এবং থানায় একটি ইউডি মামলা রুজু করেন।
মামলার অন্যতম আসামী আঃ মতিনের কন্যা মায়া বেগম (৩০) বলেন, আনন্দ যেদিন মারা গেছে ওই রাতে সে উলঙ্গ অবস্থায় বিধান মাষ্টার ও শফি মেম্বারের বাড়িতে গিয়েছিল বলে তারা জানতে পেরেছে। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বুলবুলির গোয়াল ঘরে তার লাশ দেখতে পায় তারা। বুলবুলি বেগম জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর থেকে তার বাবার বাড়ি চামটারহাটে থাকেন বলে উক্ত মায়া বেগম সাংবাদিকদের জানান। সে আরো জানায়, তাকে হত্যা করেছে প্রকৃত কিলার বাহিনী অথচ তার পরিবারের সকলকেই আসামী করা হয়েছে। হত্যাকান্ডের বিষয়ে আনন্দ মোহনের স্ত্রীর জড়িত থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, সে যদি আত্মহত্যাই করবে তাহলে তার বাড়িতেই করতে পারত। যে ভাবে ঝুলন্ত অবস্থায় তাকে দেখতে পাওয়া গেছে তাতে মনে হয়না সে আত্মহত্যা করেছে। তিনি এই হত্যাকান্ডের প্রকৃত খুনিদের খুজে বের করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানোর পাশাপাশি বুলবুলিকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে কারা আনন্দ মোহনের লাশটি তার গোয়াল ঘরে রেখে গেছে সে বিষয়ে তদন্তকারি কর্মকর্তার নিকট দাবি জানিয়েছেন। সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গেলে উল্লেখিত তথ্য বেড়িয়ে আসে।
ওই ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্যা মারজান বেগম বলেন, আনন্দ মোহন খুবই ভাল মানুষ ছিল,তার কোন শক্রও ছিলনা। কেন তাকে হত্যা করা হয়েছে তা আমার জানা নেই। তবে তাকে অনেকেই পাগল বলছে তা ঠিক না। তিনি সম্পুর্ন সুস্থ লোক ছিলেন।
এদিকে চলবলা ইউনিয়নে একজন চৌকিদার আছে যাকে সবাই ওসি হিসেবে জানে। ওই ইউনিয়নে এমন কোন ঘটনা নেই ওই স্বঘোষিত ওসি নামের চৌকিদার জানে না বলে জানান ওই নারী সদস্যা। তিনি বলেন, ওই চৌকিদারকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে খুনের আসল তথ্যই বেড়িয়ে আসবে। এদিকে একটি ঘনিষ্ট সুত্র জানায়, শিয়ালখোয়া বাজারের একজন কসমেটিক্স ব্যবসায়ী, বাকাইটারীর এক সাবেক পুলিশের পুত্র ও ওই চৌকিদারসহ বুলবুলি বেগমকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এই সংখ্যালঘু হত্যাকান্ডের আরো প্রকৃত রহস্য উন্মেচিত হবে বলে পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন।
এদিকে ময়না তদন্ত রিপোর্টে আনন্দ মোহনকে শাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে মর্মে রিপোর্ট পাওয়া গেলেও থানা পুলিশ বাদির দায়েরকৃত এজাহারটি নথিভুক্ত না করে মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা নুরুল হক আলামত নষ্ট করেছে বলে নিহতের পরিবার অভিযোগ করেছেন। এতদ সংক্রান্ত বিস্তারিত খবর বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হলে পুলিশের টনক নড়ে এবং পরে বাদীকে ২৪/৮/১৭ ইং তারিখে থানা পুলিশ ডেকে নিয়ে মামলার এজাহার গ্রহন পুর্বক হত্যা মামলা রুজু করেন। যার মামলা নং ২৮ তাং ২৪/৮/১৭ ইং, ধারা ৩০২/৩৪। এ মামলায় আঃ মতিনসহ ৬ জনকে আসামী করা হয়। দির্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার পর মামলাটির কোন কুল কিনারা না পেয়ে সিআইডি’র উপর ন্যস্ত করা হয় এবং অল্প দিনের মধ্যে সিআইডি পুলিশ বুলবুলি বেগমকে গ্রেফতারসহ রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেন। কিন্তু বুলবুলি বেগম সিআইডি’র জিজ্ঞাসাবাদে কি তথ্য দিয়েছে তা এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। ইতো মধ্যে বিজ্ঞ জজ আদালত থেকে ৩ আসামী জামিনে মুক্তি পেয়েছেন বলে জানা গেছে।
অপরদিকে সিআইডি পুলিশ হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকার প্রমান পাওয়ায় আনন্দ মোহনের স্ত্রী কল্পনা রানী, তার ভাই স্বপন চন্দ্র (৪৬), তার প্রেমিকা লক্ষন চন্দ্র (৩৪), মাখন চন্দ্র রায় (৩৪) ও সুজিৎ চন্দ্র রায় (২৮) কে গ্রেফতার করের্ছে। তারা বর্তমানে লালমনিরহাট জেলা কারাগারে রয়েছেন।
মামলার বাদি জানায়, এ হত্যাকান্ডের সাথে অনেক বড় বড় রাঘব বোয়াল জড়িত আছে। যা গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে স্বপন চন্দ্রসহ সকলকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে এসবের সঠিক তথ্য বেড়িয়ে আসবে। তবে স্বপন চন্দ্র জানায়, আমরা এতদুর থেকে শিয়ালখোয়া বাজারে গিয়ে তো আমরাই একা মারতে পারিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী শিয়ালখোয়া এলাকায় হত্যাকান্ডের সাথে আরও অনেকে জড়িত রয়েছে তা স্পষ্ট ভাবে বুঝা যাচ্ছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশেনের (অকিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ) পরিচালক (অবিযোগ ও তদন্ত) মোঃ শরীফ উদ্দিন জানান, জাতীয় মানবাধিকার সংস্থা সহযোগীতা করায় এ হত্যা মামলার এতো অগ্রগতি এবং মামলার আসামীদেও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে।
এব্যাপারে, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সাব-ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) নুরুন্নবীর সাথে মোবাইল ফোনে ২৪ জুন বিকেলে কথা হলে তিনি জানান, তদন্তে গ্রেফতারকৃত ৬ আসামীর মধ্যে ১ আসামী তার দোষ স্বীকার করায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com